অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

স্পর্শ-সংস্কৃতি: করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশ -অধ্যাপক ড. মোহীত উল আলম

করোনা সবার মাথায় মৃত্যুর রাজমুকুট পরিয়ে দিচ্ছে !

0

১৯ মার্চ প্রায় প্রত্যেক টি দৈনিক পত্রিকার খবর মোটামুটি এ রকম- বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, তার মধ্যে এক জন মারা গেছেন। নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ ভাইরাস দ্বিতীয় পর্যায় থেকে তৃতীয় পর্যায়ে হাঁটা শুরু করবে। অর্থাৎ পরিবারের লেভেল থেকে কমিউনিটি লেভেলে চলে যাবে এবং তখন তা মহামারি আকারে দেখা দেবে। নানা মহল থেকে এর মধ্যে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিদ্যমান পরিস্থিতি মহামারি ঘোষণা করার জন্য। তা না হলে লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হতে পারে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ভয়ানক মহামারি ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়েছে । কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিদেশ ফেরত অনেকেই সতর্কতা-সচেতনতা মূলকও সঙ্গনিরোধ নির্দেশনা মানছেন না।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। যেখানে কয়েক টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে হুঁশিয়ারি করা হচ্ছে, আমেরিকায় ২২ লাখ, যুক্তরাজ্যে অর্থাৎ গ্রেট ব্রিটেনে পাঁচলাখ এবং ইরানে ৩৫ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থা ভাবতে ও ভয় হয় ।

ইউনিসেফের একটি সতর্কবার্তা এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে। তার কয়েকটি শর্ত- বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের বিপক্ষে আছে বলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। বলা হচ্ছে, এরোগের জীবাণু সর্বোচ্চ ২২ থেকে ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বা তার নিচে সংক্রামক থাকে এবং এর অধিক তাপমাত্রায় এটি বাঁচতে পারে না। যখন এ লেখাটি লিখছি, তখন চট্টগ্রামের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি এবং উত্তপ্তরোদ- এই বেলা সাড়ে ১০ টায় দ্বিতীয়বার গোসল করার জন্য উসকানি দিচ্ছে। আরেকটা হলো, এই জীবাণু যেটা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় দেখতে রাজমুকুটের মতো, যার জন্য এটির নাম লাতিন শব্দ করোনা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ক্রাউন এবং বাংলায় রাজমুকুট। এই তথ্যটি আমি পেয়েছি, আমার পুরোনো ছাত্র লন্ডন প্রবাসী খালিদ রশীদের টাইম লাইন থেকে। সে বলছে, যে করোনা সবার মাথায় মৃত্যুর রাজমুকুট পরিয়ে দিচ্ছে। জীবাণুটা ওজনে একটু ভারী বিধায় বাতাসে উড়তে পারে না, ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। জীবাণুটির এই পাখা বিহীন অক্ষমতাকে আমি মনে করি বাংলাদেশের মানুষের জন্য ( বা পৃথিবীর মানুষের জন্য) একটি আশীর্বাদ। কেননা বাতাসে উড়লে ক্ষতি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বভাবতই জীবাণুটা যেহেতু প্রবলরোদ সহ্য করতে পারে না, তাই এই রৌদ্রস্নাত বাংলাদেশে এটা খুব সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে আমাদের এর মধ্যে স্বস্তি খুঁজলে চলবে না। সংক্রামক প্রতিরোধে এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত এসব ক্ষেত্রে নানা রকম ত্রুটির চিত্র আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পারছি। বিষয়টি উদ্বেগের। এ ব্যাপারে যা কিছু করণীয় সব কিছুই করতে হবে দ্রুততা, সতর্কতাও বিদ্যমান পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রেখে।

এই হামাগুড়ি দেওয়া জীবাণুটা যেখানে পড়ে সেখানেই আটকে যায়; কিন্তু বেঁচে থাকে হাতে বা মুখে ১০ মিনিট। কাপড়ে সাত-আটঘণ্টা আর শক্ত সারফেসে মাটি, ফ্লোর, টেবিল ও মেটালিক আবরণে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। এ জন্য বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ( বাংলা প্রবাদ ‘হাত ধুয়ে দেওয়া’ অর্থাৎ কাউকে ঠকানো, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই) কথা বলা হয়েছে অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত মুছতে বলা হয়েছে। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং পাঁচ বারই ওজু করেন, তাদের হাত পরিস্কার থাকার কথা। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মেও প্রচুর ধোয়া ধুয়ির ব্যাপার আছে জানি। সবই বুঝলাম বটে, কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। কোয়ারেন্টাইন করবেন কীভাবে ? মানুষ গিজগিজ করছে যেখানে প্রতিবর্গ ইঞ্চিতে, সেখানে বিষয়টা এত সহজ নয়। তাছাড়া আমাদের সচেতনতার অভাবতো আছেই। ইতালি ফেরত মুনির কে নিয়ে যে কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ফেসবুকে, তা তে আমাদের সামাজিক মানসিকতার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। মুনির স্বেচ্ছা নির্বাসনে তার গ্রামের বাড়িতে দিন কাটাবে; কিন্তু তার সব আত্মীয় স্বজন মিঠাই-পিঠা পুলি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সুদূর উত্তরবঙ্গ থেকে ও তার এক খালাশাশুড়ি দেখা করতে এসেছেন। কী তার অসুখ, কেমন করে তার দিন কেটেছে ইতালিতে বাবাংলাদেশে, এতদিন পরে এসে তার কেমন লাগছে দেশ কে ইত্যাদি জানতে তিনি ছুটে এসেছেন। মুনিরের বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের দরবার বেড়ে গেল; তারপরও মুনির ঘরের ভেতর থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে গেল। তখন তার শ্যালিকা দুলাভাইয়ের হাত ধরে বলল মৃদু আকর্ষণ করে বলল, ‘দুলাভাই, বাপের বাড়িতে তো এক সপ্তাহর ইলেন, এবার বাকি সপ্তাহটা আমাদের বাড়িতে কাটান।’ মুনির শ্বশুর বাড়িরও না দিল আর মুনিরের শাশুড়ি সে কথা শুনে জামাইয়ের জন্য মুরগির রোস্ট তৈরি করলেন। শ্বশুর কাছের হাট থেকে কিনে আনলেন আস্ত একটা ছাগল। জবাই হবে। এই হলো আমাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা। তবে এর একটা উল্টো ঘটনাও আছে। সত্য ঘটনা। ইতালি প্রবাসী স্বামী দেশে ফেরত আসছে শুনে বউ শ্বশুর বাড়ি থেকে পালিয়েছেন। এই বর্ণনায় আমাদের সমাজে সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।

গুজব ছড়ানোর অপপ্রবণতা এই সমাজে নতুন নয়। আবার এই গুজব পুঁজি করে অনেকেই নিজেদের ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টাও করেন। যেমন টি দেখা গেছে আমাদের বাজারের ক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে চাল সহ বেশকিছু নিত্যপণ্যের দাম হুহু করে বেড়ে গেছে। দায়িত্বশীলদের তরফে প্রতিকারের কথা বলা হলেও প্রতিকার চিত্র এখনও সেরকম দৃষ্টি গ্রাহ্য নয়। সংকটে সুবিধাবাদীরা নানা রকম ফায়দা লোটার জন্য তৎপর থাকে- এ রকম অভিজ্ঞতা আমাদের যথেষ্ট পুষ্ট। এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ যে সব নেতিবাচক চিত্র দাঁড় করিয়েছে, তাতে সন্দেহ জাগে আগামীতে আরও না জানি কত রকম ফন্দি-ফিকির ধান্দা বাজরা আঁটতে থাকে। এ সব ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে।

এর আগে যে লিখেছি শ্যালিকা দুলা ভাইয়ের হাত মৃদু আকর্ষণ করে বলেছিল,তাদের বাড়ি যেতে। কিন্তু কোভিড-১৯- এর অভিধানে এটা হচ্ছে টাবু, নোটাচ বিজনেস। কখনও স্পর্শ করা যাবে না, এটাই হলো মূলকথা। স্পর্শ-সংস্কৃতির জায়গাটায় আমরা (বাংলাদেশ) ফেল মারব। কারণ অতি ঘনত্বপূর্ণ দেশে স্পর্শ ছাড়া আমরা চলতেই পারিনা। এখানে চক্ষুষ্ফমান ভাবে ছেলে মেয়ে (বিবাহিত হলেও) হাত ধরা ধরি করে হাঁটার রেওয়াজ নেই। কিন্তু মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রেই তো হাত ধরাধরি করে চলে আমাদের দেশে। শুধু তাই নয়, পুরুষ বয়স্করাও আমাদের দেশে জন সমক্ষে নিশ্চিন্তে একজনের হাত আরেক জন ধরে হাঁটেন। অনেকেই সেলফি তোলার সময় অবলীলায় পিঠে হাত রাখেন। আর মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির প্রভাবও অণুকরণে ইদানীং পুরুষে পুরুষে গালঘেঁষা ঘেঁষিকরা, গালে আলতো চুমু খাওয়ার সংস্কৃতিও বেড়ে গেছে। অথচ করোনা ভাইরাসের প্রতি বিধানের প্রথম শর্ত হলো- স্পর্শ কর না । আমি মনে করি, এই উপ মহাদেশের সং স্কৃতিতে সহমর্মিতা প্রকাশের ধরনটাই হলো প্রধানত শারীরিক। তাই আমার মনে হয়, দুর্ভাগ্য ক্রমে যদি বাংলাদেশ করোনার মহামারির পর্যায়ে পৌঁছায়, তা হলে শক্তিশালী স্পর্শ-সংস্কৃতির কারণে এখানে পরিস্থিতি বিশ্বে সবচেয়ে খারাপের পর্যায়ে রূপ নেবে। এখানে অসুস্থ লোককে সেবা করার জন্য লোক থাকবেই, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও। লোক সরিয়ে একটা লোককে একা মরতে দেবে আমাদের সামাজিকও মানবিক সংস্কৃতির মধ্যে, এ মানসিকতার উপস্থিতিই নেই। এ জন্য আমাদের সতর্ক থেকেই সবকিছু করতে হবে।

তাহলে কী করতে হবে ? আমার অতিবিনীত পরামর্শ হলো, স্পর্শ-সংস্কৃতির ভীতি পরিহার করে অন্য একটি রাস্তা বের করা জরুরি। সে টাকী? এখানে সরকারের উদ্যোগতো থাকবেই, বেসরকারি উদ্যোগও থাকবে। আর সেটা হলো, এখন থেকে গ্রামে গ্রামে বা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্বেচ্ছা সেবক দল তৈরি করা। তাদের সব ধরনের নিরাপত্তা কিট দিয়ে অসংক্রমিত রাখা এবং সেবা কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া। আমাদের যেহেতু জনসংখ্যা বেশি এবং এই জনসংখ্যাকে রোগী মনে না করে সেবক মনে করে যদি আমরা করোনার মুখো মুখি হই, তাহলে মনে হয় বিস্তার ঠেকানো যাবে। এই রোগের সরাসরি প্রতিষেধক এখনও বের হয়নি। আমেরিকায় সামনের গ্রীষ্মে অর্থাৎ ২০২১-এ প্রতিষেধক বাজারে আসবে বলা হচ্ছে। এর আগ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সম্ভবত সাধারণ চিকিৎসার বাইরে কিছুই করার থাকবেনা। কিন্তু একটি সমাজের সমষ্টি গত উদ্যোগ বিফলে যাবে বলে মনে হয় না। এটাতো আর মানুষ-প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না যে, প্রতিপক্ষের ভয়ে কাজ করতে বাধাপ্রাপ্ত হতে হবে। এটা করোনা নামক মৃত্যুদূতের সঙ্গে যুদ্ধ করা। অনেক বড়যুদ্ধ। সব মানুষ মিলে কাজ করা যায় এর বিরুদ্ধে, সেরকম একটা যুদ্ধ। এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, যেহেতু করোনার ফ্যাটালিটিরেইট ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে, তাই লোকক্ষয় ট্র্যাজিক হলেও অকল্পনীয় হবে না। কিন্তু রোগে ভুগবে লাখ লাখ মানুষ এবং সেটাই বিরাট সামাজিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে । অর্থনীতির ধসের কথা আর বললাম না। তবে ভীতি নয়- সাহস, সচেতনতা, সতর্কতাও পরিকল্পিত পরিকল্প না গ্রহণ করে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের এগোতে হবে। নানা রকম দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলায় আমাদের অভিজ্ঞতা আছে- এটাই বড় মানসিক শক্তি। একই আমাদের সঙ্গে অন্যান্য আক্রান্ত দেশ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তাও পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে।

অধ্যাপক ড. মোহীত উল আলম : শিক্ষাবিদ, গবেষক, কথা সাহিত্যিক ও

সাবেক উপাচার্য : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

ত্রিশাল,ময়মনসিংহ,বাংলাদেশ ।

 

 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.