অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

চিকিৎসকের কথাঃ ডক্টর মোহাম্মাদ আজিজ রাহমান

0

এই বিদেশের মাটিতে বসে আমি সবসময়ই দেশের জন্য কিছু একটা করার তাড়না অনুভব করি। কারণ দেশে আমার শিক্ষা জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে। এদেশের মানুষের টাকায় আমি পড়েছি। তাই তাদের জন্য কিছু করার উদ্দীপনা আমার সবসময়কার। এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করি। শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঢাকা মেডিক্যালে পড়তে আসা। শেষ করার আগেও কিন্তু আমার কোন পরিকল্পনা ছিলোনা কোনো বিশেষ সাবজেক্ট-এ ক্যারিয়ার করার। মনে হয়েছে দেখা যাক না কি হয়, আগে তো ইন্টার্নশীপ-টা শেষ হোক।

আমার এই পাবলিক হেলথ ক্যারিয়ার-এর যাত্রাটা কিন্তু অনেকটা হঠাৎ করেই । এমবিবিএস লাইফের শেষ দিকে এক ইন্টার্ন ভাইয়া থেকে প্রথম পাবলিক হেলথ সম্পর্কে জানতে পারা, যেটা সম্মন্ধে তখনো আমার কোনো ধারনাই ছিল না। নিছক কৌতূহলী হয়ে ইন্টার্নশীপ শেষ করার আগেই কিছু ফার্মসিউটিক্যালস-এ চাকরির জন্য এপলাই করি, আর সৌভাগ্যবসত ইন্টার্নশিপ শেষ করার দিন সকালেই আমার প্রথম চাকরি সানোফি এভেন্টিস-এ জয়েনিং করি । সেখানে আমার কাজ ছিল ওদের অনকোলজি ডিপার্টমেন্টে। সেই কর্পোরেট চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করার সুযোগ হয় এবং বাংলদেশের ক্যান্সার ওষুধ নিয়ে গবেষণা বিদেশের কনফারেন্সে তুলে ধরার সুযোগ হয়। আর এসব কাজের মাধ্যমেই প্রথম পাবলিক হেলথে ক্যারিয়ার-এর কথা মাথায় আসে। আজকের মতো তখন আমার সামনে কোনো সিনিয়র-এর পাবলিক হেলথ-এ ক্যারিয়ার-এর কোনো উদাহরণ ছিল না।

এমপিএইচ করতে ভর্তি হয়ে গেলাম ব্র্যাক জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথে। ওখানে আমরা বাংলাদেশী ছিলাম ১৪ জন আর ১২ জন বিদেশী। জেমস পি. গ্রান্ট এ পড়তে এসে পাবলিক হেলথ-এ কাজ করার ব্যাপ্তি বুঝতে পারলাম । আমরা ব্র্যাক-এর বিভিন্ন রিমোট কার্যক্রমে হাতে-কলমে ফিল্ডে গিয়ে কাজ করতাম। একদম পুরোদস্তুর রিসার্চার হয়ে ওঠার শুরু সেখানেই। সেখান থেকে পাশ করার পর ব্র্যাক-এই কাজ করার অফার পাই। আমি বেছে নেই ওদের ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম। কাজ করতে চলে যাই আফগানিস্তান।

আফগানিস্তানে হেলথ প্রোগ্রামের প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবার সুযোগ হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে অনেকটা পরিবারের চাপেই ফেরত এসে যোগ দেই আইসিডিডিআরবি তে। আমি ছিলাম Outbreak Investigation Officer। দেশের যেকোন জায়গায় অজ্ঞাত রোগে মৃত্যুর খবর এলেই সেখানে গিয়ে ইনভেস্টিগেশন করাই ছিল আমার টিমের কাজ। প্রায় ২৮টিরও বেশি এরকম ইনভেস্টিগেশনে আমি জড়িত ছিলাম। তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লখযোগ্য হলো কাঁচা খেজুরের রস খেয়ে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হবার গবেষণাটি, যেটি পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় এক আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক জার্নালে । এই গবেষণাটার মাধ্যমে আমি অনেকটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি পেয়ে যাই৷ আমার সম্মুখে তখন আরো সামনে এগোবার পালা।

এরই মাঝে পিএইচডি এর জন্য আবেদন করতে শুরু করলাম। চাইলাম আমার এমপিএইচ-র গবেষণাটাকে এগিয়ে নিতে,যেটি ছিল হৃদরোগ আর তামাক সেবন নিয়ে। স্কলারশিপ সহ সুযোগ পেলাম অস্ট্রেলিয়ার এডিল্যাড ইউনিভার্সিটিতে। নির্ধারিত তিন বছরের আগেই শেষ করে ফেললাম আমার ডক্টরেট ডিগ্রী। আমি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার La Trobe University তে সিনিয়র লেকচারার পদে আছি, যেটি আমাদের দেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর -এর সমতুল্য। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে আমার, যার মধ্যে রয়েছে ল্যানসেট-র মতো শীর্ষ মেডিকেল জার্নাল-এ একাধিক পেপার। বিগত এক দশকে অস্ট্রেলিয়ার হেলথ ডিপার্টমেন্ট ছাড়াও চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার, যা আমার বর্তমান অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে। ইতোমধ্যেই আমার তিনজন ছাত্রছাত্রী তাদের পিএইচডি ডিগ্রী সম্পন্ন করেছে আমার সুপারভিশনে এবং বর্তমানে আরো চারজনকে আমি গাইড করছি।
পুরোদস্তর রিসার্চার হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সায়েন্টিফিক জার্নালের রিভিউয়ার হিসেবেও কাজ করছি। আমার গবেষণার ফোকাস এখন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ও তামাক।

প্রফেশনাল কাজের পাশাপাশি সবসময় চেষ্টা করি বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য অস্ট্রেলিয়াতে যতটা সম্ভব কাজ করার। মেলবোর্নের প্রথম বাংলা কমিউনিটি রেডিও স্টেশন শুরু করার জন্য কাজ করেছি এবং নিয়মিত শো করছি বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো। রিসার্চই এখন আমার ধ্যানজ্ঞান। পাশাপাশি শিক্ষকতা ও মাস্টার্স বা পিএইচডি স্টুডেন্টদেরকে সুপারভাইজ করা। বাংলাদেশও যাতে আমার রিসার্চ এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে সেই চেষ্টা আমার সবসময়ই থাকে। আর দেশে যেসকল তরুণরা পাবলিক হেলথে ক্যারিয়ার করতে চায়, তাদের জন্য আমার সাহায্যের হাত সবসময় বাড়ানোই আছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.