অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

করোনা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসহায়ত্ব

করোনা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান ।

0

করোনা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসহায়ত্ব

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম

খবরটি পড়ে অনেকটা চমকে ওঠার মতো। প্রিন্স চার্লসের করোনা ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়ে আয়ুর্বেদ এবং হোমিও প্যাথি কাজ করছে। কালের কন্ঠে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে,“ বৃহস্পতিবার প্রতিমন্ত্রী শ্রীপদ নায়েক জানান, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথির জোরেই সুস্থ হয়েছেন প্রিন্স চার্লস। আর তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বেঙ্গালুরুর বিশেষজ্ঞের। মন্ত্রী বলেন, “বেঙ্গালুরুতে ‘সৌক্য’ নামের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালান ডা.মাথাই। তিনিই ফোনে আমাকে জানান, প্রিন্স চার্লসের শরীর থেকে করোনার জীবাণু দূর করতে আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথিকেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তার চিকিৎসা সফল হয়েছে। প্রিন্স এখন সম্পূর্ণ করোনামুক্ত।” খবরটি পড়ে করোনার কাছে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসহায়ত্বের অবস্থা টের পাওয়া গেল।

আধুনিক চিকিৎসার শুরু ইউরোপে। তবে তা নিজস্ব নয়। এই চিকিৎসার ইতিহাস শুরু হয়েছিল গ্রীক, মিশরীয়, মেসোপটেমীয় কিংবা ব্যাবিলনীয় থেকে ধার করা। প্রাচীনকাল থেকেই অসুস্থতা বা মহামারীকে অদৃশ্য দানবের কাজ কিংবা অশুভ চক্রের কাজ বা ঈশ্বরের ক্রোধ নামে চিহ্নিত করা হতো। এ বিষয়ে গ্রীকদের ধারণা ছিল অনেক উন্নত। হিপোক্রেটিসকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় যিনি বিশ্বাস করতেন যে, কুসংস্কার বা ঈশ্বর থেকে নয়, বরং প্রাকৃতিক উপায়ে রোগের প্রকোপ ঘটে। পিথাগোরাসের শিষ্যদের মতে, হিপোক্রেটিস সর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন কিন্তু বস্তুতঃ তিনি ধর্ম হতে চিকিৎসাবিদ্যাকে প্রিইথক করেন এবং মতপ্রকাশ করেন যে, রোগ দেবতাদের দ্বারা ঘটে না বরং, জীবনযাপনপদ্ধতি, খাদ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দ্বারা নিরূপিত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হলে যেমন ১১১০ খ্রী. প্যারিস ১১৩০ খ্রী. বোলোগনা, ১২০৯ খ্রী. কেম্ব্রিজ চিকিৎসা জ্ঞান চর্চা ক্রমশ গতিশীল হতে থাকে। তবে তখনো চিকিৎসা শাস্ত্রে মুসলিম পন্ডিতদের যেমন আর রাজী, ইবনে সিনা, আল বিরুণী এদের জ্ঞান ও চিন্তা কর্মগুলো অনুবাদ ও চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিকিৎসা জ্ঞান চর্চার সাথে সংযুক্ত হয় উল্লেখিত মুসলিম মনীষীদের চিকিৎসা, রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যার বিষয়গুলো। শুধু তাই নয় রেনেসাঁ (১৪৫৩ খ্রী.) পূর্ববর্তী যুগে আরবীয়/ মুসলিমদের মাধ্যমে চিকিৎসা জ্ঞানের পাশাপাশি এশীয় ঔষধপত্রেরও অবাধ যাতায়াত/ ব্যবসা বানিজ্য ছিল ইউরোপে। কিন্তু রেনেসাঁ পরবর্তীযুগে বা আরো পরে ষোড়শ শতকের মধ্যভাগ থেকে ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যা নিজস্ব স্বকীয়তায় বিকশিত হয়। এ সময় বেলজিয়ান বিজ্ঞানী আন্দ্রিয়াস ভিসেলিয়াস চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান রাখেন। তাঁর সংগ্রহে থাকা ওষুধ তৈরীর সূত্রগুলো পান্ডুলিপি আকারে প্রকাশিত হয়। ১৫৮৬ খ্রি. প্রথম মুদ্রিত হয় ইউরোপীয় ফার্মাকোপিয়া। তবে ভিসেলিয়াস প্রণীত ইউরোপীয় ফার্মাকোপিয়া বা ওষুধ প্রস্তুতের আদর্শ গ্রন্থ হলেও এটি ইবনে সিনা থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি সংকলিত হয়েছিল। এতে অবশ্য গ্যালেন, ডায়োস্কোরাইডস এর মতও জুড়ে দেয়া হয়। চিকিৎসা গ্রন্থ হিসেবে এটি ইউরোপে সমাদৃত হয় এবং প্যারিস, লিওনস, ভেনিস এবং এন্টাওয়ার্প থেকে প্রকাশিত হয় । ১৬৬৬ খ্রি. মধ্যে বইটি পাঁচবার সংশোধিত হয়। অবশ্য এর মধ্যে ১৬১৮ খ্রি. লন্ডন ফার্মাকোপিয়া প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশরা লন্ডন ফার্মাকোপিয়ার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে।
সপ্তদশ শতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। হল্যান্ডের বস্ত্র ব্যবসায়ী লিউবেন হুক অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিস্কার করেন। এটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। আঠারো শতকে ঔষধ প্রস্তুত বিদ্যারও যথেষ্ট উন্নতি দেখা যায়। জার্মান চিকিৎসক হফম্যান কমলা লেবুর টনিক এবং অ্যানোডিন ওষুধ প্রস্তুত করেন। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে চিকিৎসা শাস্ত্রে সার্জারির বিষয়টা যুক্ত হয়। চিকিৎসা শাস্ত্র আধুনিক যুগে প্রবেশ করে। বাতিস্তা ব্যাপক সংখ্যক পোস্টমর্টেমের ভিত্তিতে বলেন প্রথমত রোগ, শরীরের একটি অঙ্গে বা অংশে আক্রমণ করে। কখনো কখনো রোগটি দীর্ঘকাল সেই স্থানটিতেই অবস্থান করে। আবার কখনো তা অন্যস্থানেও ছড়িয়ে পড়ে।” সার্জারীর এই তত্ত্বের সাথে যুক্ত হয় ফরাসী চিকিৎসক বিকেটের তত্ত্ব। তিনি বাতিস্তার মতবাদকেই আরো একধাপ গভীরে নিয়ে যান। তিনি অসংখ্য পোস্টমর্টেমের ভিত্তিতে এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন যে বিভিন্ন রোগে মানব দেহের আঙ্গিকগত পরিবর্তন মূলত ঐসব অঙ্গের বিধানতন্তুরই পরিবর্তন। যেটি রোগ তত্ত্ব নামে পরিচিত পায়। এ সময়ে আমরা দেখতে পাই ইংরেজ চিকিৎসক এডোয়ার্ড জেনার বসন্ত রোগের টীকা আবিস্কার করেন। তাঁর ইমিউনিটির তত্ত্ব চিকিৎসাবিদ্যার সাথে যুক্ত হয়।
ইউরোপে আধুনিক চিকিৎসার মূল প্রেরণার জায়গা ছিল শিল্প বিপ্লব। আঠারো শতকের শেষ দিকে শিল্প বিপ্লবের চাপে রাষ্ট্রশক্তি অন্যভাবে ব্যবহার হতে থাকে। নতুন গণরাষ্ট্রের ধারণায় জনস্বাস্থ্য যুক্ত হয়। রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়।
ঊনিশ এবং বিশ শতক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল যুগ । এই দুই শতকে বিজ্ঞানের অন্যান্য সব শাখার ন্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বিপ্লবাত্মক সব আবিষ্কার হয়। বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে সংঘটিত দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। উনিশ শতকে ফরাসী রসায়নবিদ লুই পাস্তর জীবাণুর ধারণা দেন। পাস্তুর দেখালেন জীবাণুর জন্ম জীবাণু থেকে এবং জীবাণু মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টি করে। অবশ্য জীবাণু তত্ত্বের আবির্ভাব হবার পর তিনশত বৎসর পূর্বে ১৫৪৬ খ্রি. ফ্রাকাস্ট্রোরো তাঁর De Contagione et Contagiosis morbis et curatione নামক বইয়ে স্পর্শক্রামক ও সংক্রামক তথ্য সম্বন্ধে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু জলাতংক রোগের জীবাণু ও প্রতিষেধক টীকা আবিস্কার লুই পাস্তুরকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
তবে এ সময়ে মহামারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে উৎসাহিত করেছে। না করে উপায়ও ছিল না । বিশেষ করে কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি মহামারী প্রকট হয়ে উঠল। ১৮৩০ সাল পযন্ত ভারত হয়ে ইউরোপ পযন্ত কলেরার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। কলেরার আতঙ্কে ইউরোপ এবং আমেরিকায় আজকের দিনের মতো পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। তখন অবস্থাটা এমন দাড়িয়েছিল মৃতের সৎকার করতে আত্মীয় স্বজন ভয় পাচ্ছে। রোগীর আপনজনেরা দুরে চলে যাচ্ছে । অবস্থার পরিত্রাণ ঘটল জার্মান চিকিৎসক রবার্ট ককের আবিস্কারের মধ্য দিয়ে। উনিশ শতকের মহামারী যক্ষ্মা ও কলেরা রোগের জীবানু আবিস্কার করেন জার্মান চিকিৎসক রবার্ট কক। তিনি অ্যানথ্রাক্স রোগেরও জীবানু আবিস্কার করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই অ্যান্টিবায়েটিকের আবিস্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অগ্রগতির প্রথম ধাপে নিয়ে যায়। প্রথম অ্যান্টিবায়োটিকটি ছিল অ্যারফেনামাইন (সালভারসন) যা ১৯০৮ সালে পল এরিলিচ আবিষ্কার করেন। তিনি আবিষ্কার করেন ব্যাক্টেরিয়া যে বিষাক্ত রঞ্জন গ্রহণ করে মানুষের কোষে তা করেনা। প্রথম এবং প্রধান এন্টিবায়োটিকস হলো সালফা ওষুধ যা জার্মান রসায়নবিদ azo dyes থেকে সংগ্রহ করেছিলেন । ১৯৪৪ সালে বিজ্ঞানী ওয়াক্সম্যান স্ট্রেপটোমাইসিন আবিস্কারের কথা ঘোষণা করেন। তারপর ১৯৪৮ সালে আবিস্কৃত হয় অরিওমাইসিন। এই সময়েই আমেরিকাতে আবিস্কার হয় ক্লোরামফেনিকল। ১৯৫০ সালে আবিস্কার হয় টেরামাইসিন। এরপর ক্রমাম্বয়ে চ নিসটাটিন, ট্রেটাসাইক্লিন, কর্টিসন, অ্যালডোস্টেরোন ইত্যাদি। এভাবে চলতে থাকে ওষুধ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি। তারপরেও বহুরোগের ওষুধ এবং রোগের উৎস এখনো অজানা। জীবাণু, ভাইরাস, অ্যান্টিবডি, টক্সিন ইত্যাদি প্রতিরোধের যত উপায় এ পযন্ত আবিস্কৃত হয়েছে, তার কোনটিই মানবদেহের পক্ষে নিশ্চিত নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়নি।
খোদ আমেরিকাতে গত শতকের পঞ্চাশের দশকেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধের দাবী ওঠে। ক্লোরামফেনিকল ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরামর্শ দেয়া হচ্ছে ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের। রাসায়নিক পদ্ধতিতে উৎপন্ন ওষুধের বদলে প্রাকৃতিক ও লোকজ ওষুধের দিকে। ভয়াবহ করোনার দিনগুলিতে থামিয়ে দিচ্ছে খোদ ইউরোপ, আমেরিকা সহ সমগ্র বিশ্বকে। চিকিৎসা বলতে কোয়ারেনটাইন।

লেখাটা শেষ করব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। কোয়ারেনটাইন এভাবে ধরা দিয়েছে শরৎ সাহিত্যে। ঠিক আজকের বাস্তবতার মতো।

“পরদিন বেলা এগার-বারটার মধ্যে জাহাজ রেঙ্গুন পৌঁছিবে; কিন্তু ভোর না হইতেই সমস্ত লোকের মুখচোখে একটা ভয় ও চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। চারিদিক হইতে একটা অস্ফুট শব্দ কানে আসিতে লাগিল, কেরেন্টিন। খবর লইয়া জানিলাম, কথাটা quarantine: তখন প্লেগের ভয়ে বর্মা গভর্নমেন্ট অত্যন্ত সাবধান। শহর হইতে আট-দশ মাইল দূরে একটা চড়ায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়া খানিকটা স্থান ঘিরিয়া লইয়া অনেকগুলি কুঁড়েঘর তৈয়ারি করা হইয়াছে; ইহারই মধ্যে সমস্ত ডেকের যাত্রীদের নির্বিচারে নামাইয়া দেওয়া হয়। দশদিন বাস করার পর, তবে ইহারা শহরে প্রবেশ করিতে পায়।”

[ এক মাস পরে ফেসবুকে লিখলাম। মহামারীতে কিছু লিখব সেই ইচ্ছা ছিল না। তারপরেও লিখলাম। সবাই বাসায় থাকুন, নিরাপদে থাকুন] লেখক:প্রো-ভাইস চ্যান্সলর-পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.