অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

করোনায় বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক। —নরেশ মধু

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক বাড়ছে-নরেশ মধু ।

0

৯৮ বছরের প্রিন্স ও তার স্ত্রী ৯৩ বছরের এলিজাবেথকে ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদ বাকিংহাম প্যালেস ছেড়ে যেতে হবে। আমরাও পিছিয়ে নেই করোনা ভাইরাস থেকে । করোনা ছড়িয়ে গেছে ১২১ দেশ। মোট আক্রান্ত ১৭ হাজার  ৬৬০ জন। মৃতের সংখ্যা ৪৭৪৯। ইতালেিত একদিনে মৃতের সংখ্যা ২৫০।বৃে সমুদ্র স্থল ও আকাশ পথে গমনাগমন শিথিল। সারা বিশ^জুড়ে এক চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কলকারখানা বন্ধ। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্থবির। অপরদিকে হাজার হাজার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত লাশ পুড়িয়ে ফেলছে চীন! দ্য সান পত্রিকা লিখে ফেলল, চীন করোনার প্রমাণ ধ্বংস করছে। গোটা দুনিয়া বিশ্বাস করে, চীন তথ্য লুকোয়। গোপনে অনেক অপকর্ম করে। সুতরাং খবরটি চাউর হতে সময় লাগেনি। ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তথ্য প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিশ^।
দৈনিক পত্রিকা ছাড়াও অনলাইন নিউজ নামে অসংখ্য ওয়েবসাইট ওৎ পেতে থাকে চটকদার গালগল্পের অপেক্ষায়। উইন্ডি ডট কম নামে একটি ট্যুইটার অ্যাকাউন্টে মিলল আতঙ্কের আরেক খবর। কয়েকটি স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে যে, উহানে আগুন জ্বলছে। বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা স্যাটেলাইট চিত্র। খবর হয় যে উহানের বাতাসে মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রার সালফার ডাই-অক্সাইড জমা হচ্ছে। কেমিক্যাল ঢেলে হাজার হাজার মৃত প্রাণী পোড়ালে এমনটি হওয়ার কথা। অতএব, গোটা বিশ্বে একটি অনুমান ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, সংক্রমণ ঠেকাতে লাশ তো বটেই, চীন সম্ভবত করোনায় আক্রান্ত মৃতপ্রায় রোগীদেরও পুড়িয়ে মারছে। কিন্তু, পরে জানা গেল যে, স্যাটেলাইটের ছবিগুলি আসলে আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘জিইওএস-৫’ নামে একটি পরিবেশদূষণের পূর্বানুমানের মডেলিংয়ের ছবি। এই মডেলিং ভবিষ্যতে বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অস্তিত্ব ও পরিবেশ বিপর্যয় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই ধারণা দেয়। এর সঙ্গে করোনা ভাইরাসের কোনও সম্পর্ক নেই। তা ছাড়া উহানের বাতাসে সালফার ডাই–অক্সাইডের ঘনত্ব আগে থেকেই বিপজ্জনক পর্যায়ের। একেই বলে গুজব! আর তা পত্রপত্রিকা, টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই শাখায়-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর এই কারিকুরি নিয়ে সতর্ক করেছে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও।
অপরিসীম ক্ষমতাধর চীনের প্রশাসনও এবার নিজেদের দেশের ভিতরেই গুজব সামলাতে পারেনি। যখন সত্য জানার উপায় থাকে না, তখনই গুজব ছড়ায়। রাষ্ট্র সত্য না বললে বা অন্যদের সত্য বলতে না দিলে জনগণ বিকল্প সত্য বিশ্বাস করতে শুরু করে। চীনের জনগণ নিজেরাই সরকারি তথ্য বিশ্বাস করে না। চীনের সরকার সেই ভুলের মাশুল গুনছে এখন। আন্তর্জাতিকভাবে চীনের ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ পরিচিতি তৈরি হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বময় করোনা ভাইরাস ভীতি গণ–আতঙ্কের রূপ নিয়েছে।
আতঙ্ক আছড়ে পড়েছে আমাদের দেশেও। ‘মুরগি খেলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে’! এই ভ্রান্ত ধারণায় আম বাঙালি মুরগি খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। কী করে জানতে পারলেন চিকেনে করোনা ভাইরাস আছে? জিজ্ঞাসা করুন, অনেকেই বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপে দেখেছি।’ সোশ্যাল মিডিয়া মারফত এই ভুয়ো প্রচারে পোলট্রি শিল্পে  কোটি কোটি টাকা ক্ষতি গুনছে।  অথচ, সম্প্রতি ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মুরগিতে করোনা ভাইরাস নেই। মটন, সামুদ্রিক ফুড নিয়েও আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। তবুও ভয় পিছু ছাড়ছে না। কে না জানে, বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে তড়িৎক্রিয়া, কিন্তু সহজ করেছে হিস্টিরিয়া।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় করোনা ভাইরাস নিয়ে নানা স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শগুলি। এসব পরামর্শের বেশিরভাগই ভুয়ো। এগুলো ক্ষতিকর নাও হতে পারে। আবার বিপজ্জনকও হতে পারে। যেমন ধরুন রসুন। ফেসবুকে রসুন নিয়ে অনেক পোস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকে বলছে, রসুন খেলে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সম্ভব। অথচ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  বলছে, রসুন একটি স্বাস্থ্যকর খাবার। প্রচলিত ধারণা আছে যে রসুন অনেক ধরনের সংক্রমণ রোধ করতে পারে। তবে এ রকম কোনও প্রমাণ নেই যে, রসুন খেলে মানুষ করোনো ভাইরাস থেকে রক্ষা পাবে। দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে জানা যায়, এক মহিলা নাকি দেড় কেজি রসুন খেয়ে ফেলেছিলেন। গলায় সংক্রমণের পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সাধারণভাবে ফল, সব্জি ও জল স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে, এগুলো খেলে করোনো ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফেসবুকের বেশ কিছু পোস্টে দেখা গিয়েছে, জাপানি এক চিকিৎসক প্রতি ১৫ মিনিটে জল খেতে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং জানিয়েছেন, করোনো ভাইরাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এর মধ্যে কিছু ভাইরাস মুখেও যেতে পারে। তবে ঘনঘন জল খেলে এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবে এমন কোনও প্রমাণ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণরোধে গরম জল পান, গরম জলে স্নান করা ও চুল শুকানোর যন্ত্র (হেয়ার ড্রায়ার) ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। আইসক্রিম না খেতেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকী অনেক পোস্টে ইউনিসেফ এই ধরনের পরামর্শ দিয়েছে বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। ইউনিসেফের কর্মী শার্লট গরনিৎজকা জানিয়েছেন, ‘এ ধরনের প্রচার পুরোপুরি মিথ্যে। আমরা জানি, গরমে ফ্লু-জনিত ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না। তবে আমরা এখনও জানি না যে, করোনা ভাইরাসের উপর গরম কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।’ বাংলাদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের অধ্যাপক ড. হেলাল মহিউদ্দিনের কথায়, ইতিহাসই প্রমাণ, প্রতিটি মহামারীতেই গুজব বাতাসের আগে ছড়ায় এবং গুজবগুলো সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দেয়। মাত্র সাত-আট দশক আগে মাঝেমধ্যেই ওলাওঠা রোগটি ছড়াত। বাংলার গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত এই রোগে। একটি গুজব কীভাবে যেন প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল যে, গ্রামে ‘ওলাবিবি’ নামে এক ডাইনি এলেই ওলাওঠা মহামারীর রূপ নেয়। খোঁড়া কুকুরদের উপর ভর করে ওলাবিবি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। ফলে ওলাওঠা দেখা গেলেই খোঁড়া হোক বা না হোক, নির্বিচারে কুকুরনিধন শুরু হয়ে যেত। কুকুর নিধনযজ্ঞ শেষে শুরু হতো ডায়েরিয়া–কলেরার মহামারী। গ্রামে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা ছিল না। বিষ্ঠাভোজী কুকুরের অভাবে যত্রতত্র করা কাঁচা পয়ঃকর্ম পরিষ্কার হতো না। সেগুলোতে মাছি বসত। মাছি বসত খাবারে। ফলে, কলেরা-ডায়েরিয়ার মহামারী। এখন একই রকম গুজবে বাদুড় ও অন্যান্য পাখিনিধন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে যে, বাদুড় মারার সঙ্গে সঙ্গেই চীনে পঙ্গপালের উৎপাত বাড়ছে। বাদুড়ের অভাবে পঙ্গপাল বাড়লে ব্যাপক ফসলহানি ঘটবে। খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হবে। মশকজাতীয় পোকামাকড় বাড়বে। ফলে ডেঙ্গু বাড়বে। ম্যালেরিয়া ফিরে আসবে। গুজব যে কী ভয়াবহ মহামারীর জন্ম দিতে পারে, সেটি দেখতে পাওয়া যায় মধ্যযুগে ইউরোপ ও ইউরোপের উপনিবেশগুলোয় কয়েক কোটি মানুষের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে কালো বিড়ালনিধন শুরু হয়। কালো বিড়ালে ভর করে শয়তান বা অপ-আত্মা সমাজে নানা অনিষ্ট তৈরি করে—এই ছিল কালো বিড়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ। জনমনস্তত্ত্ব এমনই যে, ভয় পেলে বাছ-বিচার ভুলে যায়। কালো বিড়াল, সাদা বিড়াল না দেখে বিড়াল দেখামাত্রই নিধনযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। বিড়াল মরে সাফ হয়ে যাওয়ায় ইঁদুরের দখলে চলে যায় গোটা ইউরোপ। কোটি কোটি ইঁদুর। ফসল কাটে। খাবারে মুখ দেয়। মানুষও মারে। ইঁদুরের গায়ে উকুনের মতো একটি পরজীবী অণুজীবই ছিল। প্লেগের জীবাণু। ফলে লাখে লাখে মানুষ মরতে শুরু করল ইউরোপে। একই সময়ে উপনিবেশ তৈরির জন্য নতুন নতুন জায়গার অন্বেষণে সমুদ্রপথে বেরিয়ে পড়েছিল ইউরোপীয়রা। খাবার-পানীয়র বাক্সপেঁটরায় চড়ে জাহাজগুলোতে উঠে পড়েছিল অসংখ্য ইঁদুরও। ফলে প্লেগের দাপটে জাহাজেই মরেছিল বহু মানুষ। নতুন জমি দখল করার পর নব্য উপনিবেশগুলোতেও নেমে পড়েছিল
ইঁদুরের দঙ্গল। ফলে উপনিবেশগুলোতেও প্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিড়াল–সংক্রান্ত গুজবটি জনমনস্তত্ত্বে যে গণ–আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, বর্তমান অবস্থাটি সে রকম না হলেও সতর্ক হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। নয়তো করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের চেষ্টাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে গুজবনির্ভর করোনাভীতি এবং বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া। ভাইরাসটির ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য এই সময়ে যখন গোটা দুনিয়ার সব ক’টি দেশের সমন্বিত চেষ্টা প্রয়োজন, তখন গুজবের ডালপালা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিদ্বেষকে না কমিয়ে বরং আরও উসকে দিচ্ছে প্রতিদিনই। এর ফল মারাত্মক!

নরেশ মধু
উন্নয়ন শ্রমিক , সাংবাদিক ও  কলামিষ্ট
E-mail : pabna.observer@gmail.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.