অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাতকাহন – ড.মো: আনোয়ারুল ইসলাম ।

চিকিৎসা জগতে হোমিওপ্যাথি ।

0

বাংলার কালজয়ী লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্পে নানান পেশার লোকের বিবরণ আছে। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত বামুনের মেয়ে উপন্যাসে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। উপন্যাসের নায়িকা সন্ধ্যার বাবা প্রিয়নাথ মুখার্জি হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। তিনি গ্রামে কিভাবে চিকিৎসা করেছেন বা বিশ শতকের বাংলার জনস্বাস্থ্যের দুর্দান্ত চিত্র ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের সংলাপেই পুরো বিষয়টা চলে এসেছে-

“সন্ধ্যা আনত-মুখে মুখ টিপিয়া শুধু একটু হাসিল, জননীর কোন কথার উত্তর দিল না। তাহার সেলাই প্রায় শেষ হইয়াছিল, ছুঁচ-সুতা প্রভৃতি এখনকার মত একটা ছোট সাবানের বাক্সে গুছাইয়া রাখিয়া উঠিবার উপক্রম করিতেছিল, তাহার পিতার সোরগোলে চমকিয়া মুখ তুলিল। তিনি সদাই ব্যস্ত, – এইমাত্র বাড়ি ঢুকিয়াছেন, হাতে একটা হোমিওপ্যাথি ঔষধের ছোট বাক্স এবং বগলে চাপা কয়েকখানা ডাক্তারি বই। মেয়েকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিলেন, সন্ধ্যে, ওঠ ত মা, চট্ করে আমার বড় ওষুধের বাক্সটা একবার- কি যে করি কিছুই ভেবে পাইনে- এমনি মুশকিলের মধ্যে-… …….
দেরি! আমার কি নাবার-খাবার ফুরসত আছে তোরা ভাবিস? যে রোগীটির কাছে না যাব তারই রাগ, তারই অভিমান। প্রিয় মুখুয্যের হাতের এক ফোঁটা ওষুধ না পেলে যেন কেউ আর বাঁচবে না।”

রোগী দেখার উপায় এবং হোমিও ঔষধ নির্বাচনের চিত্রও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।

“ আ: – থাম না সন্ধ্যে। কেসটা স্টাডি করতে দে না। সিমিলিয়া সিমিলিবস! রেমিডি সিলেক্ট করা ত ছেলেখেলা নয়। বদনাম হয়ে যাবে। হুঁ, তারপরে?
বেদনাটা কি রকম বল দেখি রামময়?
আজ্ঞে বড্ড বেদনা ঠাকুরমশাই।
আহা ত নয়, কি রকমের বেদনা? ঘর্ষণবৎ, না মর্ষণবৎ, সূচীবিদ্ধৎ, না বৃশ্চিক-দংশনবৎ। কনকন করচে, না ঝনঝন করচে?
আজ্ঞে হাঁ, ঠাকুরমশাই, ঠিক ওই রকম করচে।
তা হলে ঝনঝন করচে! ঠিক তাই! তারপরে?
তারপরে আর কি হবে ঠাকুরমশাই, কাল থেকে ব্যথায় মরে যাচ্চি-
থামো, থামো! কি বললে, মরে যাচ্চ?… …
প্রিয়বাবু মেয়ের প্রতি চাহিয়া একটু হাস্য করিয়া বলিলেন, না মা, না। এ আর্ণিকা কেস নায়। বিপনে হলে তাই দিয়ে দিত বটে। চার ফোঁটা একোনাইট তিরিশ শক্তি। দু’ঘন্টা অন্তর খাবে।
সন্ধ্যা দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিল, একোনাইট বাবা?
হ্যাঁ, মা, হ্যাঁ। মৃত্যুভয়! পড়ে মরব! সিমিলিয়া সিমিলিবস কিউরেন্টার! মহাত্মা হেরিং বলেছেন, রোগের নয়, রোগীর চিকিৎসা করবে। মৃত্যুভয়ে একোনাইট প্রধান।”

বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় অসুখ বিসুখের প্রতিকারের জন্য হোমিওচর্চা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমাদের হয়তো অনেকেরই অজানা বাংলায় হোমিওপ্যাথির চর্চা জনপ্রিয় হয়েছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েট চিকিৎসক এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একদল বিজ্ঞানীদের হাত ধরেই। এক্ষেত্রে যাঁর নাম অগ্রগণ্য তিনি হলেন ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্সেস এর প্রতিষ্ঠাতা ডা: মহেন্দ্রলাল সরকার। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের গ্রাজুয়েট ডা: মহেন্দ্রলাল সরকার ১৮৬২ খ্রী. এম.ডি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসে (আইএমএস) যোগ দেন। ব্রিটিশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের কলকাতা শাখার অন্যতম সক্রিয় এই কর্মী পরবর্তীতে হোমিওপ্যাথি চর্চা শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যে তিনি একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ক্রমাম্বয়ে তিনি হোমিও প্যাথিক চিকিৎসা শাস্ত্রের বই পত্র পড়া শুরু করেন। মর্গান এর লেখা ফিলসফি অব হোমিওপ্যাথি বইটি পড়ে তিনি অবাক হন। এরপর লন্ডন থেকে আরো অনেক বই পত্র সংগ্রহ করেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৮৬৭ খ্রি. ১৬ ফ্রেবুয়ারি তারিখে বেঙ্গল মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের এক সভায় বক্তৃতাকালে তিনি হোমিওপ্যাথিকে এ্যালোপ্যাথির চেয়ে শ্রেয়তর বলে উল্লেখ করেন ।এতে যা হবার তাই হলো। ওই সভাতেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকগন ডাক্তার ওয়ালা, ডাক্তার ইওয়ার্ট, ডাক্তার চক্রবর্তী এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু ডাক্তার মহেন্দ্রলাল দমবার পাত্র ছিলেন না। তিনি বেঙ্গল মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের সদস্য হতে নিজেকে অব্যাহতি নিয়ে নেন। হোমিও চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু পথটি অত সহজ ছিল না। হোমিও চিকিৎসা নিতে রোগীরা আগ্রহ বোধ করতেন না। হোমিও শাস্ত্রের বিশ্বস্ততার ক্ষেত্র তৈরীর জন্য ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার ১৮৬৭ খ্রি. ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন সম্পাদনা শুরু করেন। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের জীবনী রচয়িতা লিখেছেন, “ বঙ্গবাসী দেখিল, লোকটার ভিতর অদম্য তেজ। এই পত্রিকা প্রকাশ করিয়া মহেন্দ্রলাল নবোদ্যমে প্রচার কায চালাইতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে হোমিওপ্যাথির প্রতি লোকে আকৃষ্ট হইতে লাগিল। কিন্তু মহেন্দ্র লাল এক বিষয়ে সর্বদা সজাগ ছিলেন। তিনি নিজেকে কখনও প্রচার করিতেন না।… এই ঘোরতর অগ্নি পরীক্ষার মধ্যেও তাই তিনি স্থিরভাবে বলিতে পারিতেন- I was sustained by my faith in the ultimate triumph of truth. কলকাতায় হোমিও চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁকে উৎসাহ প্রদান করেছিলেন ডা: রাজেন্দ্র লাল দত্ত। তিনিও এক সময় কিছু দিনের জন্য কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন। ফাদার অব ইন্ডিয়ান হোমিওপ্যাথি খ্যাত ডা: রাজেন্দ্রলাল দত্ত পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ কলকাতার ওই সময়ের খ্যাতিমান অনেকেরই চিকিৎসা করে খ্যাতি ও যশ অর্জন করেন। এগুলো ১৮৬০ সাল পরবর্তী সময়ের ঘটনা। তবে ভারতবর্ষে বা বাংলায় হোমিও চিকিৎসার শুরু হয়েছিল ইউরোপীয়ানদের হাত ধরেই। প্রাথমিক পযায়ে ইন্ডিয়ান সিভিল এবং মিলিটারী সার্ভিসে কর্মরত কিছু ইউরোপীয়ান শখের বশে হোমিও চিকিৎসা করতেন। লন্ডন মিশনারী সোসাইটি, কলকাতার একজন সদস্য ড. মুলেন (Dr. Mullen) হোমিও চিকিৎসার শুরু করেছিলেন। John Martin Honigberger কলকাতায় তিনি কলেরা ডাক্তার নামে পরিচিত ছিলেন। এরকম আরো যাঁদের নাম করা যায় তাঁরা হলেন- Mr. Ed. D’. Latour Dr. Cooper and Dr. J. R. Russell ,Dr. H. Ryfoer । বাংলার ডেপুটি গভর্ণর Sir John Hunter Little এর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৫১ খ্রী. হোমিও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ফরাসী এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক Dr. Tonnere কে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনিও পরবর্তীকালে হোমিও ডাক্তার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এভাবে উনিশ শতকের শেষের দিকে কলকাতায় হোমিও চিকিৎসা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুর দিকে বাঙালি চিকিৎসক হিসেবে যাদের নাম করা যেতে পারে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ডা: প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার। ১৮৭৮ খ্রি. কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা মেধাবী ছাত্র ডা: প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এম.ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তীকালে আমৃত্যু তিনি হোমিও চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি অসংখ্য বই রচনা ছাড়াও ইন্ডিয়ান হোমিওপ্যাথিক রিভিউ নামে পত্রিকার সম্পাদনা এবং কলকাতা হোমিও প্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। ডা. বিকে বোস একজন নামকরা চিকিৎসক ছিলেন। তিনিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে এম.ডি এবং ডি.ও. ডিগ্রী অর্জন করেন। ভারতে প্রত্যাগত হয়ে প্রথমে কিছুদিন বেনারসে এবং নেহেরু পরিবারের বিশেষ করে মতিলাল নেহেরুর পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। শেষের দিকে কলকাতায় ফিরে তিনি কলকাতা হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালের সাথে যুক্ত হন। উনিশ শতকে কলকাতার হোমিও ঔষুধ বিপনন এবং চিকিৎসার সাথে আরো যুক্ত ছিলেন স্যার মহেশ চন্দ্র ভট্টাচায। তাঁর সম্পর্কে বলা হয় : At the end of 19th century, another great man Sri Mahesh Chandra Bhattacharya with a broad imagination and outlook entered into the field of homoeopathy as a chemist and pharmacist. He used to selling good quality medicines at a very cheap rate and thus making homoeopathic medicines popular among poor people of our country. He also compiled and published a pharmacopoeia in Bengali and English. ডা: প্রতাপ চন্দ্র মজুমদারের দৌহিত্র ডা: জে এন মজুমদার ছিলেন আরেক দিকপাল। মি. জে এন মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওলজী বিষয়ে এম এস সি এবং এম.বি ডিগ্রী অর্জন করেন। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরার রয়েল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফ.আর.সি. এস ডিগ্রী নেন। তিনি কলকাতায় ফিরে এসে হোমিও চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং হোমিও চিকিৎসাকে সরকারী স্বীকৃতি দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। উনিশ শতকে এরকম আরো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা হোমিও চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন।

বিশ শতকের শুরুতেও বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণী হোমিও চিকিৎসাতে আকৃষ্ট হতেন। মফস্বল জেলাগুলোতে হোমিওপ্যাথিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অন্য পেশার লোকজনও সহজেই হোমিও কোর্স করে প্র্যাকটিস করতে থাকেন। উকিল এবং শিক্ষক এই দুই শ্রেণীর লোক এই পেশায় যুক্ত হন। এছাড়াও এই সময়ে মহামারী ছিল নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। জ্বর, কলেরা, বসন্ত বাংলার জনজীবনকে ব্যাহত করে তুলছিল। এ্যালোপাথিক চিকিৎসার ইনজেকশন, স্যালাইন এবং কুইনাইনের ভীতি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছিল। ফলে হোমিও ডাক্তারদের ব্যবসা ছিল বেশ রমরমা। ডাক্তার বাবু নামে পরিচিত এসকল লোক খুব সহজেই রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রে বা ভদ্রলোক হিসেবে গণ্য হবার আকাঙ্খাও পেশাকে জনপ্রিয় করে তোলে। উনিশ শতকের শেষের দিকে কলকাতা থেকে হোমিও বিষয়ক প্রচুর প্রকাশনা বের হতে থাকে। এর মধ্যে ছিল বই পুস্তক, পত্র পত্রিকা ইত্যাদি। এই প্রকাশনা সহজেই হোমিও চিকিৎসায় আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। বিশ শতকের প্রথম দিকে মহামারী ঠেকানোর জন্য অল্প শিক্ষিত লোকের বোঝার জন্য প্রচুর হোমিও চিকিৎসার বই প্রকাশ হতে থাকে। কলেরা, জ্বর, বসন্ত, নারী ও শিশু রোাগের উপর লেখা বই গুলো পড়লে খুবই অবাক হতে হয়। এগুলোর বিজ্ঞাপনেও এ ধরণের শব্দ ও বাক্য ব্যবহার হতো। উদাহরণ স্বরূপ তার দু একটির আলোচনা করা যেতে পারে- যেমন ১৯০০ খ্রি. কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ডা. কে. এন ঘোষের সচিত্র ডাক্তারী । হোমিও প্যাথিক চিকিৎসা ওলাউঠা। ঢাকার নবাব স্যার আবদুল গণী কে.সি. আই মহোদয়ের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। কলেরার উপর বইটি লিখতে গিয়ে ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “ বর্তমান ভারতবর্ষে বিশেষত: বঙ্গদেশে ওলাউঠার আপাতত: যেরূপ প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, এ সময় ওলাউঠা চিকিৎসার একখানি পুস্তকের বিশেষ আবশ্যক হইয়াছে। এই পুস্তকে রোগের নানা অবস্থার দৃষ্টান্ত সম্বলিত চিকিৎসা এবং প্রত্যেক চিত্র ও তাহার বিশেষ বিবরণ দেওয়াতে সকলেই অতি সহজে রোগের অবস্থা বুঝিয়া চিকিৎসা করিতে পারিবেন। ” ১৯০৭ খ্রি. ডাক্তার যদুনাথ মুখোপাধ্যায় জ্বরের উপর পূর্ণাঙ্গ তিন খন্ডের বই লেখেন। যে সময় ম্যালেরিয়া জ্বরের ভয়াবহ অবস্থা, সে সময় স্বল্প শিক্ষিত লোকের জন্য এ ধরণের বই নিশ্চয় কাজে এসেছিল। বইটি পড়ে অনেক পাঠক সেই মতামত পাঠিয়েছিলেন। টাঙ্গাইল থেকে লেখা এক পাঠকের অভিমত “ মেডিকেল স্কুলে তিন বৎসর বড় বড় নামজাদা ডাক্তারের উপদেশ শুনিয়া ও বৈ পড়িয়া যে ফল না হয় আপনার বৈ আগাগোড়া একবার পড়িলেই সে ফল হয়।” এসব প্রকাশনা এখনো পড়লে বিস্মিত হতে হয়। শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা পড়লে আজকের ভাইরাস রোগ সম্পর্কে জানা সহজ হতো। ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে তিনি লিখছেন, “ ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের সহিত প্রত্যেকেই পরিচিত। অধুনা ইহা প্রায় বর্ষে বর্ষে প্রতি শীতকালে বিভিন্ন তীব্রতায় আবির্ভূত হয়। সাধারণত: উপলদ্ধি হয় না যে বিসূচিকা, আন্ত্রিকজ্বর (টাইফয়েড), গ্রন্থিকজ্বর (প্লেগ) এবং অন্যান্য ভীষণ মহামারী অপেক্ষা অধিক লোক ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। জনসাধারণের স্মৃতিশক্তি স্বভাবত:ই ক্ষীণ, এজন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত: কয়েক বৎসর পযন্ত অদৃশ্য থাকিয়া পুনরায় প্রবল প্রকোপে আবির্ভূত হইলে জনসাধারণ, এমন কি চিকিৎসকগণও ইহাকে “নূতন ব্যাধি” বলিয়া সিদ্ধান্ত করেন।” হোমিওপ্যাথির প্রকাশনা দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় আকৃষ্ট হন। সাধারণ মানুষের কাছে ডাক্তারি ভাষার কঠিন শব্দগুলোকে তিনি বাংলা ভাষায় নতুন করে তর্জমা করে পরিবেশন করেন যাতে সাধারণ মানুষ দেহতত্বের গুরুগম্ভীরতাকে সরলভাবে বুঝতে পারে। যেমন মেডিকেল টার্মিনোলজিতে ‘ফ্যাগোসাইটিক’ কোষগুলোর কাজ হল ক্ষতিকর কোষগুলোকে গিলে ফেলা। তিনি ‘ফ্যাগোসাইটিক’ কোষের নামকরণ করেন ‘ভক্ষক কোষ’। আবার ‘ব্লাড প্লাজমা’র নামকরণ করেন ‘বর্ণহীন রস’ ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় কতটা পারদর্শী ছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় রাণী মহলানবিশের অসুখের সময়। রাণী মহলানবিশ ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সহধর্মিনী। একবার নির্মলকুমারী মহলানবিশ খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর চিকিত্সার জন্যে ডাকা হয় সে সময়ের বিখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ নীলরতন সরকার ও আরও অনেক চিকিৎসককে, কিন্তু তাঁর জ্বর কমাতে কেউ পারেন নি। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় নির্মলকুমারী মহলানবিশ টাইফয়েড জ্বর থেকে আরোগ্য লাভ করেন। তাঁর সময়ে হোমিও চিকিৎসায় যথেষ্ট সাড়া ফেলেন ডাঃ প্রতাপ মজুমদার। তিনিও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের মতামত নিতেন।
####
লেখক:প্রো-ভাইস চ্যান্সলর – পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.